লিউব্লিয়ানা, ০১ এপ্রিল – স্লোভেনিয়াতে ক্রমশ বেড়েই চলছে কোভিড-১৯ খ্যাত নোভেল করোনা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা। আজ বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে নয়টায় স্লোভেনিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী স্লোভেনিয়াতে এখন পর্যন্ত ৮৪১ জনের শরীরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পজিটিভ ধরা পড়েছে। যে সংখ্যাটি গতকাল পর্যন্ত ছিল ৮০৪ জনে।
এক দিনের ব্যবধানে নতুন করে আরও ৩৭ জন এ ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন। একই সঙ্গে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চার জনের মৃত্যুর খবর দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে স্লোভেনিয়াতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে মৃতের সংখ্যা পৌঁছালো ১৫ আর এ পর্যন্ত সুস্থ্য হয়ে বাসায় ফিরেছেন ১০ জন।
গত ১৯ মার্চ থেকেই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধ করার জন্য সম্পূর্ণ স্লোভেনিয়াতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল যা এখনো বলবৎ আছে। তবে এখনও স্লোভেনিয়ার বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে অনেক ফ্যাক্টরি রয়েছে যেগুলো এখনও সীমিত পরিসরে হলেও তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করছে বলে জানা গেছে।
সকল ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গত ১৬ মার্চ থেকে পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। আগামী ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হবে। বন্ধ রাখা হয়েছে সকল ধরণের বাস ও ট্রেন সার্ভিস চলাচল এবং পরিস্থিতির সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটা পর্যন্ত দেশটির রাজধানী লুবলিয়ানাতে অবস্থিত ইয়োজে পুচনিক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকেও সকল ধরণের বিমান চলাচল স্থগিত রাখা হয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় না রেখে যদি একই স্থানে পাঁচ জনের অধিক জমায়েত হয় তাহলে প্রত্যেকেকে ৪০০ ইউরো করে জরিমানা করা হবে। এছাড়াও গতকাল (মঙ্গলবার) স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে এখন থেকে খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ এক মিউনিসিপ্যালিটি থেকে অন্য মিউনিসিপ্যালিটিতেও যাতায়াত করতে পারবে না।
যে কোনও পাবলিক প্লেসে যাতায়াত করতে হলে এখন থেকে সকলকে মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভস পরিধান করতে হবে। যে কোন জরুরি প্রয়োজনে ১১২, ০৮০১৪০৪ কিংবা +৩৮৬৩১৬৪৬৬১৭ এ তিনটি নম্বরের যে কোন একটি নাম্বারে ফোন দিতে বলা হয়েছে।
বিশেষ করে কেউ যদি মনে করেন যে তার শরীরে করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এছাড়াও স্লোভেনিয়াতে বসবাসরত অন্য দেশের নাগরিকদেরকে নিজ দেশের নিকটস্থ অ্যাম্বাসি কিংবা কনস্যুলেট অফিসের সঙ্গে যে কোনও প্রয়োজনে যোগাযোগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেশি ইতালির মতো ক্রোয়েশিয়া এবং হাঙ্গেরির সঙ্গে স্লোভেনিয়ার সীমান্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্ট ছাড়া বাকি সকল ক্ষেত্রে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে স্লোভেনিয়ার সীমান্ত আপাতত: বন্ধ রয়েছে।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে গোটা পৃথিবীর মধ্যে ইতালি সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে থাকলেও পশ্চিম স্লোভেনিয়াতে অর্থাৎ স্লোভেনিয়া ও ইতালির সীমান্তবর্তী অঞ্চলে করোনাভাইরাসের প্রকোপ সবচেয়ে কম এবং শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এ অঞ্চলে মাত্র ৯ জনকে শনাক্ত করা গেছে যাদের শরীরে এ ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়েছে।
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো স্লোভেনিয়াতেও বিস্তার লাভ করা করোনাভাইরাসের প্রভাব দেশটির অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষের জনজীবনে প্রবলভাবে হতাশা বিরাজ করছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্লোভেনিয়ার ইন্সটিটিউট অব ম্যাক্রোইকোনোমিক অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পক্ষ থেকে চলতি অর্থ বছরে স্লোভেনিয়ার প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিলো সাড়ে তিন শতাংশ।
কিন্তু সাম্প্রতিককালে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো স্লোভেনিয়াতেও ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রভাবে এ প্রবৃদ্ধির হার অর্ধেকে নেমে আসতে পারে বলে দেশটির অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন।
এদিকে শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাতটায় এক রেডিও বার্তায় দেশটির অর্থমন্ত্রী আন্দ্রেই শিরচেলির পক্ষ থেকে এ পরিস্থিতিতে যারা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তাদের পুনর্বাসনের জন্য বেশ কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে এ সময়ে আত্মনির্ভরশীল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যাদেরকে প্রতিমাসে সরকারকে ৪০০ ইউরো করে প্রদান করতে হতো কিন্তু এ পরিস্থিতিতে তাদেরকে এ অর্থ প্রদান করতে হবে না বলে স্লোভেনিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি তাদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি বেসিক অর্থ বরাদ্দ প্রদানের কথাও বলা হয়েছে। এছাড়া যারা শিক্ষার্থী রয়েছেন তাদেরকে আগামী এপ্রিল এবং মে এ দুইমাস ২০০ থেকে ৩০০ ইউরো করে আর্থিক অনুদান প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
এ পরিস্থিতির কারণে এ সময়ে যারা সাময়িকভাবে বেকারত্ব সমস্যায় ভুগছেন তাদেরকে এপ্রিল এবং মে এই দুই মাসে ৭০০ ইউরো করে অর্থ সাহায্য দেওয়ার কথা এ প্রস্তাবনায় উঠে এসেছে।
একইসঙ্গে কৃষক এবং স্লোভেনিয়াতে যারা পেনশনভোগী তাদেরকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা এ প্রস্তাবনায় উঠে এসেছে। সম্পূর্ণ প্রস্তাবনাটি এ সপ্তাহের মধ্যে দেশটির জাতীয় সংসদে পাশ হতে পারে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে।
তবে এখনও বেশ কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছে। স্লোভেনিয়াতে যারা অন্যান্য দেশের অভিবাসী রয়েছেন তাদের বিষয়ে আসলে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে কোন নির্দেশনা আসেনি। বিশেষ করে এক সময় যুগোস্লাভিয়ার অধীনে থাকা অন্যান্য দেশ যেমন: বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা, কসোভো, ক্রোয়েশিয়া, মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, মন্টিনেগ্রো এ সকল দেশের থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইমিগ্র্যান্ট স্লোভেনিয়াতে বসবাস করেন এবং তাদের অনেকের নিজস্ব ব্যবসা রয়েছে স্লোভেনিয়াতে।
অনেকে আবার এখানে বিভিন্ন ধরণের জীবিকার সঙ্গে জড়িত এবং কেউবা আবার স্লোভেনিয়াতে বিভিন্ন শিক্ষা-প্ৰতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছেন। তাদের বিষয়ে আসলে এখন পর্যন্ত স্লোভেনিয়ার সরকারের পক্ষ থেকে কোনও ঘোষণা আসেনি।
এমনকি স্লোভেনিয়ার সরকারের ঘোষিত এ সকল আর্থিক সাহায্যের অংশীদার তারা হতে পারবেন কি এ নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গিয়েছে। এছাড়াও অভিবাসীদের মধ্যে যাদের এ মুহূর্তে এ পরিস্থিতির জন্য কোনও কাজ নেই কিংবা যাদের রেসিডেন্স পারমিট প্রায় শেষের দিকে তাদের ব্যাপারেও স্পষ্ট কোন সিদ্ধান্ত স্লোভেনিয়ার সরকারের পক্ষ থেকে এখনও আসেনি।