ঢাকা, ২৯ মার্চ- নতুন-পুরনো মিলিয়ে হানিফ পরিবহনের বাসের সংখ্যা কমবেশি এক হাজার। নতুন বাসগুলোর সবক’টিই ব্যাংকের ঋণের টাকায় কেনা, যেগুলোর কিস্তি চলমান। এসব বাস থেকে আয়ের সিংহভাগই চলে যায় কিস্তি পরিশোধে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ। রয়েছে বন্ধের মেয়াদ দীর্ঘ হওয়ার শঙ্কা। ফলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কা করছেন হানিফ পরিবহনের কর্মকর্তারা।
সারা দেশে কয়েকশ বাস চলে এনা পরিবহনের, যার একটা বড় অংশ বেসরকারি ব্যাংকের অর্থায়নে কেনা। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাওয়ার কথা বলছেন এনা পরিবহনের কর্মকর্তারাও। শুধু হানিফ বা এনা নয়, একই শঙ্কায় রয়েছেন দেশের সব বাস মালিক। ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিকরাও আছেন বিপদে। সবচেয়ে বিপদে আছেন ব্যাংকঋণ নিয়ে কেনা গাড়ির মালিকরা। গাড়ি বন্ধ থাকায় ঋণ পরিশোধ নিয়ে উদ্বেগ-শঙ্কা বাড়ছে তাদের।
মালিক সংগঠনগুলোর হিসাবে দূরপাল্লার রুটে চলে, সারা দেশে এমন বাস কোম্পানির সংখ্যা দেড় শতাধিক। এর বাইরে একক মালিকানায়ও পরিচালিত হয় অনেক বাস। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, ২০১১ থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে নিবন্ধিত হয়েছে ২২ হাজার ৩৭৮টি বাস। একই সময়ে মিনিবাস নিবন্ধিত হয়েছে ৩ হাজার ৬৪৭টি। পরিবহন মালিকরা জানিয়েছেন, এসব বাসের সিংহভাগই বিভিন্ন ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কেনা। করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘমেয়াদে গাড়ি বন্ধ থাকলে ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়বেন মালিকরা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও এনা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, এ অবস্থায় শুধু যে পরিবহন মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তা কিন্তু নয়। মালিকদের মতোই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন পরিবহন চালক-শ্রমিকরা। গাড়ি বন্ধ থাকায় রোজগারহীন হয়ে পড়েছেন তারা। দেশে দীর্ঘমেয়াদে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থাকলে তাদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে বলে মনে করেন তিনি।
২০১১ থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিআরটিএ থেকে নিবন্ধিত কার্গো ও কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা ৩৫ হাজার ১৫৪। একই সময়ে ৭১ হাজার মাঝারি ট্রাক ও ৯৬ হাজার ২৬১টি পিকআপের (ছোট ট্রাক) নিবন্ধন দিয়েছে বিআরটিএ। ব্যাংকঋণ পরিশোধ নিয়ে শঙ্কায় আছে এসব ট্রাক ও পিকআপ মালিকদের একটা বড় অংশ।
মালিক সংগঠনগুলোর হিসাবে, সারা দেশে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা দুই লাখের মতো। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ৬০-৭০ হাজার ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান চলাচল করে থাকে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর দৈনিক ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান চলাচল ৪০-৪৫ হাজারে নেমে আসে। আর গণপরিবহন বন্ধের পর সংখ্যাটি নেমে এসেছে মাত্র ৮-১০ হাজারে।
ট্রিপ না থাকায় পরিবহন মালিকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান মালিক, ট্রাক পণ্য পরিবহন মালিক সমিতির অন্যতম শীর্ষ নেতা মকবুল আহমেদ। তিনি বলেন, ট্রিপ পাওয়া যাচ্ছে। প্রায় সব ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান বসে আছে। আমাদের অনেক মালিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনেছেন। গাড়ি ভাড়া দিয়ে যে টাকা আয় হয়, তার একটা বড় অংশই ঋণ পরিশোধে চলে যায় তাদের। বর্তমান অবস্থায় সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন এসব ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক।
তবে করোনায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের সময় এখনো আসেনি বলে মনে করেন বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক তালুকদার। তিনি বলেন, আমরা খুব খারাপ একটা সময় অতিবাহিত করছি। দেশে এমন কোনো মানুষ নেই, যারা করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না। শিল্প-কারখানা, করপোরেট, ধনী, গরিব এমনকি রাস্তার ভিক্ষুকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমরা কবে এ খারাপ অবস্থা থেকে বের হতে পারব, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমি মনে করি, এ মুহূর্তে লাভ-ক্ষতির হিসাব না টেনে ভাইরাসটির কবল থেকে কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায়, মানুষকে কীভাবে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায়, সেদিকে নজর দেয়া উচিত।
সূত্র : বনিকবার্তা