বুধবার, এপ্রিল ২, ২০২৫

গরুর দুধ ৫ টাকা লিটার!

Must read

সিরাজগঞ্জ, ২৭ মার্চ- করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি মিল্ক ভিটা কারখানা তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এ কারণে পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার দেড় লাখ দুগ্ধ উৎপাদনকারী কৃষকের উৎপাদিত গরুর দুধ খুচরা বাজারে ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হলেও শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির ননভ্যাট দুধ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫ টাকা লিটার দরে। অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনাটি সত্য বলে জানিয়েছেন এ সমিতির সভাপতি ওয়াজ আলী।

তিনি জানান, বাজারে ক্রেতা নেই। তাই কৃষকের কিছুটা লোকসান ঠেকাতে দুধ থেকে মেশিনের সাহায্যে পুরো ভ্যাট তুলে নেয়া হচ্ছে। এরপর ননভ্যাট দুধ ৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে স্বল্প আয়ের মানুষ সহজেই দুধ কিনে খেতে পারছেন। ভ্যাট তুলে নিলেও দুধের গুণমান ঠিক থাকে। স্বাদের দিক দিয়ে একটু কম হয়। এ ননভ্যাট দুধ দিয়ে দই, মিষ্টি, পায়েশ, পিঠা সব কিছুই তৈরি করা যায়। এটা স্বাস্থ্যের জন্যও খুব ভালো।

তবে যারা এই ভ্যাট তুলতে পারছেন না তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। দুধ বিক্রি করতে না পেরে তারা ভ্যানে করে দুধ নিয়ে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করছেন। এতে তাদের গো-খাদ্যের দামই উঠছে না।

এসবের ফলে দুধের রাজধানী খ্যাত পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় কৃষকরা পানির দরে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ওপর হঠাৎ করেই গো-খাদ্যের দাম বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা চরম লোকসানে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, আশির দশক থেকে পাবনা জেলার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া উপজেলা নিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ দুগ্ধ অঞ্চল গড়ে উঠেছে। শাহজাদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী এ এলাকায় প্রায় ২৫ হাজারেরও বেশি গো-খামার রয়েছে। এছাড়া এ অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি কৃষক তাদের বাসগৃহে দুগ্ধ উৎপাদনকারী গাভী লালন পালন করেন। ফলে প্রতিদিন এ অঞ্চলে প্রায় ১০ লাখ লিটার গরুর দুধ উৎপাদিত হয়।

প্রচুর দুধ উৎপাদন হওয়ায় এ এলাকা থেকে মিল্ক ভিটা, আড়ং, প্রাণ ডেইরি, ফার্মফ্রেস, অ্যামোমিল্ক, আফতাব, রংপুর ডেইরি, ব্র্যাকসহ প্রায় ২০টি দেশীয় প্রতিষ্ঠান তরল দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে সারাদেশে বাজারজাত করে। এ সব প্রতিষ্ঠানের দুধ সংগ্রহের পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ লিটার। বাকি দুধ স্থানীয় ঘোষ বা দুধ ব্যবসায়ীরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দুধসহ ঘি ও ছানা তৈরি করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠান। এছাড়া স্থানীয়ভাবেও মিষ্টিজাত কারখানা ও চায়ের দোকানে প্রচুর দুধ প্রয়োজন হয়।

খামারিরা জানান, দেশে করোনাভাইরাসের প্রভাবে ঢাকাসহ বড় বড় শহরে দুধের চাহিদা কমে গেছে। লোকজন ঢাকা শহর ছাড়তে থাকায় সেখানে গত দু-তিন দিন ধরে দুধ প্রায় বিক্রিই হচ্ছে না। এছাড়া পাবনা-সিরাজগঞ্জ এলাকাতেও দুধের চাহিদা ব্যাপক কমে গেছে। এ এলাকায় শতাধিক ছানা তৈরির কারখানায় প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার দুধের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এখন করোনার প্রভাবে বেশির ভাগ ছানা তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া এ এলাকার চায়ের দোকানগুলোও গত দুদিন ধরে বন্ধ। মিষ্টি তৈরির দোকানেও দুধের চাহিদা নেই। ফলে গরুর দুধের চাহিদা নেই বললেই চলে।

খামারিদের অভিযোগ, দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই খামারি ও কৃষকদের দুধ বিক্রি করার প্রধান ভরসা। কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান দুধ নেয়া কমিয়ে দিয়েছে। শুধুমাত্র প্রাণ ডেইরি গুড়ো দুধ তৈরির জন্য ১ লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ অব্যাহত রাখলেও বাকি ৯ লাখ দুধ নিয়ে কৃষক বিপাকে পড়েছে।

কৃষকদের দাবি, প্রতি লিটার দুধের উৎপাদন খরচ পড়ে ৪২ টাকা। কিন্তু দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি লিটার দুধের দাম দিচ্ছে ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকাভুক্ত খামারিদের বাইরের কেউ সেখানে দুধ বিক্রি করতে পারছে না। এ অবস্থায় গত দু’দিন হলো অধিকাংশ কৃষক ও খামারিকে স্থানীয় বাজারগুলোতে ও ভ্যানে করে গ্রামে গ্রামে ফেরি করে ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করতে দেখা গেছে। এছাড়া অনেক খামারি গ্রাহক না পাওয়ায় ১০ থেকে ১৫ টাকা লিটার দরেও দুধ বিক্রি করেছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে মাদলা নতুনপাড়ার খামারি জাহাঙ্গী হোসেন, আলমগীর হোসেন ও তানভীর রহমান হালিম জানান, দুধ বিক্রি করতে না পেরে তাদের খামারের উৎপাদিত দুধ বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়েছেন। যেটুকু বিক্রি করেছেন তা মাত্র ১০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করা হয়েছে।

সাঁথিয়া উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামের খামারি বেলায়েত হোসেন জানান, তার এলাকায় দুধ ২০ থেকে ২৫ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। এর উপর করোনাভাইরাসের প্রভাবে হঠাৎ করেই বাজারে গোখাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। চারদিন আগেও ৪৫ কেজি ওজনের এক বস্তা ভুসির দাম ছিল ১২২০ টাকা। এখন তা বেড়েয় বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ টাকায়। তিন-চারদিনের ব্যবধানে ৩০০ টাকা মণের খড়ের দাম বেড়ে হয়েছে ৪৫০ টাকা।

ভাঙ্গুড়াদুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি ফজলুর রহমান জানান, পাবনার ভাঙ্গুড়া ও চাটমোহর উপজেলার কৃষকরা ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে দুধ বিক্রি করছেন। আবার অনেককে স্থান ভেদে ১৫ টাকা দরেও বিক্রি করতে দেখা গেছে। দুগ্ধ শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারকে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ বিষয়ে বাঘাবাড়ি মিল্ক ভিটা কারখানার ডিজিএম ডা. ইদ্রিস আলী জানান, করোনার প্রভাবে সরকারি নির্দেশে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সরকার আবার নির্দেশ দিলে ফ্যাক্টরি চালু করা হবে।

- Advertisement -spot_img

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

Latest article